রবিবার, ৩১শে আগস্ট ২০২৫, ১৬ই ভাদ্র ১৪৩২


পুষ্টিগুণে ভরপুর বাদাম


প্রকাশিত:
৩১ আগস্ট ২০২৫ ১৬:৪৭

আপডেট:
৩১ আগস্ট ২০২৫ ২০:৪২

ছবি সংগৃহীত

হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ ‘বাদাম’-কে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। ইরাকে একটি খনন কাজ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৫০,০০০ সালেও বাদাম ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং প্রাচীন গ্রিক এবং রোমানদের মধ্যে সেই সময়ে আখরোট একটি প্রিয় খাদ্য বলে বিবেচিত হতো বিশেষ করে রোমানরা এটিকে দেবতার খাদ্য বলে মনে করতো। তবে বাদামে উচ্চ মাত্রার চর্বি থাকায় বিগত কয়েক দশকে খাদ্য উপাদান হিসেবে এটি গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই কমে এসেছিল। তবে পরবর্তীতে গবেষণায় উঠে আসে যে বাদামে বিদ্যমান চর্বি শরীরের জন্য যথেষ্ট উপকারী আর বাদামে থাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসহ বিভিন্ন ধরনের খনিজ পদার্থ যা শরীরের দৈনন্দিন চাহিদা মিটিয়ে শরীরকে সুস্থ রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণায় আরও দেখা যায় যারা প্রতিদিন ২৮ গ্রাম থেকে ১০ গ্রাম পরিমাণ বাদাম খায় তাদের মধ্যে রোগজনিত মৃত্যুর হার প্রায় ২৩ শতাংশ হ্রাস পায়। এমনকি যারা সপ্তাহে অন্তত একদিন বাদাম খায় তাদের মধ্যেও মৃত্যু হার ৭ শতাংশ হ্রাস পায়। তাই পুষ্টিগুণ বিচারে বিশ্বে তথা আমাদের দেশেও বাদাম খাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বেড়ে চলেছে।

যদিও সব ধরনের বাদামেই চর্বির পরিমাণ বেশি কিন্তু এই চর্বিগুলো হয় একক(মনো) অসম্পৃক্ত নয় বহু(পলি) জাতীয় অসম্পৃক্ত চর্বি যেগুলো শরীরের জন্য উপকারী বলে প্রমাণিত। এগুলোয় আছে হৃদপিণ্ডবান্ধব বলে পরিচিত ওমেগা-৩ এবং ওমেগা-৬ ফ্যাটি এসিড যেগুলো রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায় অথচ ভাল কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে এবং হৃদপিণ্ড সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। এই চর্বিগুলো শরীরে সঠিক মাত্রায় এবং অনুপাতে থাকলে তা হার্টএ্যাটাক হওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস করে, রক্তচাপ ও রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, রক্তের শিরায় ‘প্লাক’ জমে শিরা সরু হয়ে যাওয়ার প্রবণতাকে বাঁধা প্রদান করে স্ট্রোকের সম্ভাবনা হ্রাস করে এবং রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে তোলে। এই ফ্যাটি এসিডগুলো মস্তিষ্কের কোষকলার ধ্বংস ঠেকাতে এবং নতুন কোষকলা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে, মস্তিষ্ককে আলঝাইমার্স জাতীয় অসুস্থতা থেকে রক্ষা করে এবং হতাশাজনিত রোগ থেকে মুক্ত থাকতে সাহায্য করে। যেহেতু আমাদের শরীর ওমেগা-৩ এবং ওমেগা-৬ ফ্যাটি এসিড জাতীয় চর্বিগুলো উৎপাদন করতে পারে না তাই খাদ্য থেকে এগুলো গ্রহণ করার চেষ্টা করা প্রয়োজন।

বাদাম অ্যামাইনো এসিড সমৃদ্ধ উদ্ভিজ্জ আমিষের একটি ভালো উৎস। আর উদ্ভিজ্জ আমিষ হওয়ায় প্রাণীজ আমিষের মতো এগুলোতে কোলেস্টেরল থাকে না। অ্যামাইনো এসিড শরীরের বিভিন্ন বিপাকীয় কার্যক্রমজনিত ক্ষয় পূরণ করে কোষকলার পুনর্গঠন ও বৃদ্ধিতে মাংসপেশি সুগঠিত করে এবং শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করে।

বাদামে থাকে ভিটামিন ‘ই’। গবেষণায় দেখা গেছে ভিটামিন ‘ই’-র অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সদৃশ গুণাবলী রক্তবাহী নালীগুলোয় রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি করে এগুলো সচল রাখে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং হৃদপিণ্ডে রক্ত প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে বাঁধা প্রদান করে। তাছাড়া এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীর অভ্যন্তরস্থ বিভিন্ন জৈব প্রক্রিয়া থেকে উৎপাদিত ‘ফ্রি রেডিকেলগুলো’ কোষকলার ক্ষতিসাধনে বাঁধা প্রদান করে রোগ-প্রতিরোধক ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে, শরীরকে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ধরনের প্রদাহজনিত সমস্যা থেকে সুরক্ষা দেয়, ত্বককে সুন্দর ও মসৃণ রাখে, চোখের স্বাস্থ্য রক্ষা করে এবং বুড়ো হওয়ার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করে তুলতেও ভূমিকা রাখে।

বিভিন্ন বাদামে বিভিন্ন মাত্রায় বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ‘বি’ বিদ্যমান থাকে। ভিটামিন ‘বি ১’ (থায়ামাইন), ‘বি ২’ (রিবোফ্লোবিন), ‘বি ৩’ (নায়াসিন), ‘বি ৬’, ’বি ৯’ (ফোলেট) ইত্যাদি উপাদানগুলো কার্বোহাইড্রেট ও আমিষ থেকে শক্তি উৎপাদনে, কোষকলা গঠনে, জন্মগত ত্রুটি ঠেকাতে এবং হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, ইনসুলিন, হিমোগ্লোবিন এবং অ্যান্টিবডি উৎপাদনে সাহায্য করে প্রদাহ দমনে ভূমিকা রাখে, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে, মস্তিষ্ককে প্রদাহজনিত বিভিন্ন অসুস্থতা থেকে রক্ষা করে, স্মৃতিশক্তি ও বোধশক্তি বৃদ্ধি করে, মানসিক চাপ কমাতে এবং হতাশাজনিত অসুস্থতা রোধেও সাহায্য করে।

আঁশজাতীয় উপাদান বেশি থাকায় বাদাম কোষ্ঠকাঠিন্য রোধে, অন্ত্রে ভালো ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধিতে এবং হজমশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। ক্ষুধার অনুভূতি কমিয়ে এনে ওজন হ্রাসেও সহায়তা করে। এগুলোয় বিদ্যমান তামা, ম্যাগনেসিয়াম, জিঙ্ক, ম্যাঙ্গানিজ ইত্যাদি খনিজ পদার্থ যেগুলো শরীরের বিভিন্ন বিপাকীয় পদ্ধতি সঠিকভাবে পরিচালনায় সহযোগিতা করে রোগ-প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। বাদামে বিদ্যমান ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস দাঁত ও হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষা করে, মাংসপেশি ও হাড়ের কোষকলা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে।

সব ধরনের বাদামই শরীরের জন্য উপকারী কিন্তু এগুলোর মধ্যে আখরোট ও কাঠবাদামকে (আলমন্ডস্) বর্তমানে পুষ্টিগুণের জন্য ‘সুপারফুড’ বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। তবে প্রতিদিন অল্প পরিমাণে বাদাম খাওয়া ভালো হলেও বেশি পরিমাণে খেলে মুটিয়ে যাওয়া, বদহজমজাতীয় সমস্যা, কিডনিতে পাথর তৈরি হওয়া জনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে বাদাম থেকে এলার্জিজনিত সমস্যাও সৃষ্টি হতে পারে।

সিদ্ধ, ভাজা বা অন্য কোনো উপায়ে প্রক্রিয়াজাত বাদামের তুলনায় যেকোনো ধরনের কাঁচা বাদামে পুষ্টিগুণ অনেক বেশি থাকে।

যে সব বাদামের উপরে পাতলা বাদামি রংয়ের আবরণ থাকে সেসব বাদামে এই আবরণটিতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পরিমাণে বেশি থাকায় এটি ফেলে দেওয়া উচিত নয়। ভাজার কারণে বাদাম থেকে কোনো কোনো ভিটামিন এবং মিনারেল নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কম থেকে মধ্যম তাপমাত্রায় অল্প সময়ে ভাজার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলে ভিটামিন ও মিনারেল হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে আসে।

এখন কয়েক ধরনের অতি পরিচিত ১ আউন্স (২৮ গ্রাম) পরিমাণ বাদামের পুষ্টিগুণের উপর আলোকপাত করা যাক।

কাঠবাদাম (আলমন্ডস্): পুষ্টিগুণের বিবেচনায় এই বাদামটির অবস্থান শীর্ষে বলা যায়। ১ আউন্স (২৮ গ্রাম) পরিমাণ এই বাদামে থাকে: আঁশ-৩.৫ গ্রাম, আমিষ- ৬ গ্রাম, চর্বি - ১৪ গ্রাম যার মধ্যে ৯ গ্রামই একক অসম্পৃক্ত, সুপারিশকৃত দৈনিক গ্রহণযোগ্য মাত্রার (আরডিআই) ৩৭ শতাংশ থাকে ভিটামিন ‘ই’ অর্থাৎ প্রায় ২৫.৬৩ মিলিগ্রাম, ১.২ মিলিগ্রাম ম্যাঙ্গানিজ, ৮৪ মিলিগ্রাম থাকে ম্যাগনেসিয়াম, ৭০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১.২২ মিলিগ্রাম আয়রন, ২০৬ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ১৪৭ মিলিগ্রাম ফসফরাস, জিঙ্ক - ১ মিলিগ্রাম, কপার- ০.২৭ মিলিগ্রাম, রিবোফ্লোবিন- ০.২২ মিলিগ্রাম, থায়ামিন (ভিটামিন -বি-৯) - ০.০৬ মিলিগ্রাম, নায়াসিন (ভিটামিন -বি-৩)-০.৯৫ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি-৬ ০.০৩ মিলিগ্রাম, ফোলেট (ভিটামিন -বি-৯) - ১৭ মাইক্রোগ্রাম।

আখরোট: ১ আউন্স আখরোটে ১৯০ ক্যালরি, ৪ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ১৮ গ্রাম ফ্যাট যার মধ্যে ১৩ গ্রামই পলি এবং ৩ গ্রাম মনো ধরনের অসম্পৃক্ত ফ্যাট, ২ গ্রাম আঁশ, ৪ গ্রাম আমিষ, ১২৫ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ৩০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১ মিলিগ্রাম সোডিয়াম, ০.৮ মিলিগ্রাম আয়রন, ভিটামিন সি - ০.৪ মিলিগ্রাম এবং ১১শতাংশ ম্যাগনেসিয়াম থাকে।

কাজুবাদাম: ১ আউন্স কাজুতে ১৫৭ ক্যালরি, ৯ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ১২.৪৩ গ্রাম ফ্যাট, ০.৯ গ্রাম আঁশ, ৫.১৭ গ্রাম আমিষ, ১০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১.৮৯ মিলিগ্রাম আয়রন, ৮৩ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম, ১৬৮ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ১৮৭ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ৩ মিলিগ্রাম সোডিয়াম, ১.৬৪ মিলিগ্রাম জিঙ্ক, ৭ মিলিগ্রাম ফোলেট ছাড়াও অল্প পরিমাণে অন্যান্য ধরনের ভিটামিন-বি এবং সি থাকে।

পেস্তা বাদাম: ১ আউন্স পরিমাণ এই বাদামে থাকে ১৫৯ ক্যালরি, চর্বি - ১২.৯ গ্রাম যার মধ্যে ১১.২ গ্রামই অসম্পৃক্ত, ৫.৭ গ্রাম আমিষ, কার্বোহাইড্রেট-৮ গ্রাম, ৩ গ্রাম আঁশ, ০.৩ মিলিগ্রাম সোডিয়াম, ভিটামিন সি –১.৬ মিলিগ্রাম, ১.১ মিলিগ্রাম আয়রন, ২৯.৮ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ২৯১.১ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ১৩৯.২ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম- ১২১ মিলিগ্রাম, ম্যাঙ্গানিজ- ১.২ মিলিগ্রাম, জিঙ্ক -২.২ মিলিগ্রাম, কপার-১.৩ মিলিগ্রাম, ভিটামিন ই- ২.৮৬ মিলিগ্রাম, সেলেনিয়াম-৭.০ মাইক্রোগ্রাম, রিবোফ্লোবিন- ০.২ মিলিগ্রাম, নায়াসিন-১.৩ মিলিগ্রাম, থায়ামাইন-১ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি-৬ থাকে ‘আরডিআই’র মাত্রার ২৮ শতাংশ, ফোলেট - ৬১.৫ মাইক্রোগ্রাম, ভিটামিন কে-১৬.২ মাইক্রোগ্রাম।

চীনাবাদাম: চীনাবাদাম, সিম জাতীয় একটি বীজ। ১ আউন্স পরিমাণ এই বাদামে থাকে ১৬১ ক্যালরি, আমিষ-৭.৩ গ্রাম, কার্বোহাইড্রেট-৪.৬ গ্রাম, আঁশ -২.৪ গ্রাম, মোট চর্বির পরিমাণ ১৮ গ্রাম যার মধ্যে ১১.৩ গ্রামই অসম্পৃক্ত চর্বি, ভিটামিন ই -২.৪ মিলিগ্রাম, জিঙ্ক - ০.৯৩ মিলিগ্রাম, কপার -০.৩২ মিলিগ্রাম, সেলেনিয়াম- ২ মাইক্রোগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম- ৪৮ মিলিগ্রাম, ফসফরাস-১০৭ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম - ২০০ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম -২৬ মিলিগ্রাম, আয়রন - ১.৩ মিলিগ্রাম, নায়াসিন -৩.৪ মিলিগ্রাম, থায়ামিন - ০.১৮ মিলিগ্রাম, রিবোফ্লোবিন ০.০৪ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি ৬- ০.১০ মিলিগ্রাম, ফোলেট -৬৮ মাইক্রোগ্রাম।

ড. জাকিয়া বেগম : মেডিকেল ফিজিসিস্ট এবং পরমাণু বিজ্ঞানী, অধ্যাপক, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


রিসোর্সফুল পল্টন সিটি (১১ তলা) ৫১-৫১/এ, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
মোবাইল: ০১৭১১-৯৫০৫৬২, ০১৯১২-১৬৩৮২২
ইমেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক: মো. জেহাদ হোসেন চৌধুরী

রংধনু মিডিয়া লিমিটেড এর একটি প্রতিষ্ঠান।

Developed with by
Top