বৃহস্পতিবার, ১৯শে মার্চ ২০২৬, ৪ঠা চৈত্র ১৪৩২


যেভাবে বিশ্বসেরা পেসারে পরিণত হয়েছেন তাসকিন-মুস্তাফিজরা!

খেলা ডেস্ক

প্রকাশিত:১৮ মার্চ ২০২৬, ১৬:২৭

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

একসময় স্পিন-নির্ভর দল হিসেবে পরিচিতি ছিল বাংলাদেশের। মোহাম্মদ রফিক, আব্দুর রাজ্জাক কিংবা সাকিব আল হাসানদের ভিড়ে নামকরা পেসার বলতে গেলে বিশ্বসেরাদের কাতারে সেরকম বড় মুখ ছিল না। আর এখন টাইগার পেসাররা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও রাজ করছেন। মুস্তাফিজুর রহমান ও তাসকিন আহমেদরা কীভাবে বিশ্বসেরা পেসারে পরিণত হয়েছেন সেই গল্প তুলে ধরেছে ক্রিকেটের অ্যালমানাকখ্যাত ম্যাগাজিন উইজডেন।

২০১৫ সালে মাশরাফি বিন মুর্তজা নেতৃত্বাধীন দলে বাংলাদেশের পেসাররা বিশ্বক্রিকেটে আলোচনায় আসেন। তবে উইজডেনের মতে, পরিবর্তনের শুরুটা ২০২২ সালের মার্চে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর দিয়ে। সেখানে সিরিজ খেলতে নামার আগে ইতিহাস ছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে। এর আগে প্রোটিয়া ভূমিতে ১৩টি ওয়ানডে খেলেও জয়ের মুখ দেখেনি টাইগাররা। এমনকি সেখানে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে দুই সহযোগী দেশের বিপক্ষেও হারতে হয়েছিল। অবশ্য কারণ বোঝা কঠিন নয়। সিম সহায়ক কন্ডিশনে ব্যাকফুটে ছিল বাংলাদেশ।

২০২২ সিরিজের আগে বাংলাদেশ প্রতি ম্যাচে গড়ে ২৩ ওভার পেস বোলিং ব্যবহার করত। যেখানে প্রতি ম্যাচে গড়ে ২৩ ওভার বল করে পেয়েছিল মাত্র ৩৭ উইকেট, গড় ছিল ৫৩.৬৭। এমন বোলিং আক্রমণ নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় জয়ের আশা করা কঠিনই ছিল। কিন্তু পেস বোলিংয়ে ২০২২ সাল ছিল বাংলাদেশের ভাগ্য বদলের বছর। নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্টে এবাদত হোসেন ক্যারিয়ারের সেরা স্পেল করেন, পাশাপাশি শরিফুল ইসলাম ও তাসকিন আহমেদও তিনটি করে উইকেট নেন। সেটাই ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় জয়।

দক্ষিণ আফ্রিকায় যখন বাংলাদেশ প্রথম ওয়ানডে জেতে, সিরিজের প্রথম ম্যাচে ব্যাটাররা ৩১৪/৭ স্কোর তোলার পর তাসকিন ও শরিফুল মিলে পাঁচটি উইকেট নেন। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে কাগিসো রাবাদার দুর্দান্ত বোলিংয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং ধসে পড়ে, ফলে সিরিজে সমতা ফেরায় স্বাগতিকরা। সেঞ্চুরিয়নে সিরিজনির্ধারণী ম্যাচে তাসকিনের ৫ উইকেট আর মুস্তাফিজের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ৪৬/০ থেকে ১৫৪ রানে গুটিয়ে যায় স্বাগতিকরা। ফলে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ আফ্রিকায় ওয়ানডে সিরিজ জয়ের স্বাদ পায় বাংলাদেশ। পুরো সিরিজে তাসকিন মাত্র ১৪ রান গড়ে ৮ উইকেট শিকার করেন।

এর আগে ক্যারিয়ারজুড়ে কোনো বাংলাদেশি পেসার দক্ষিণ আফ্রিকায় এত উইকেট নিতে পারেননি। মুস্তাফিজের ইকোনমি ছিল ওভারপ্রতি ৪.৩০, আর শরিফুল প্রথম ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। চার বছর পর নিউজিল্যান্ডে টেস্ট জয়টি হয়তো দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়ানডে সিরিজ জয়ের চেয়ে বেশি উদযাপিত হয়েছে। তবে দুটি ঘটনাকে একসুতোয় বেঁধেছে একটি বিষয়– উভয়ক্ষেত্রেই বড় ভূমিকা ছিল পেসারদের। ডারবানে পরবর্তী টেস্টে ব্যাটিং ধসে পড়ে চতুর্থ ইনিংসে ৫৩ রানে অলআউট হলেও তার আগে পেসাররা মিলে ১১ উইকেট নেন। তা ছিল বাংলাদেশ বা জিম্বাবুয়ের বাইরে টেস্টে পেসারদের ১০ বা তারচেয়ে বেশি উইকেট নেওয়ার মাত্র তৃতীয় ঘটনা (দ্বিতীয়টি ছিল মাউন্ট মঙ্গানুইতে)। এরপর তারা আরও চারবার ওই কীর্তি গড়েছে।

ওয়ানডেতে বদলের ধারা

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের মাটিতে বাংলাদেশের ছেলেদের ওয়ানডে রেকর্ড বেশ শক্তিশালী। ২০১৪ সালের নভেম্বরের শুরু থেকে ঘরের মাঠে তারা জিতেছে ৪৮টি ওয়ানডে এবং হেরেছে ১৯টি। জয়-পরাজয়ের অনুপাত ২.৫২৬, বিপরীতে দক্ষিণ আফ্রিকার ২.১২, শ্রীলঙ্কার ১.৩৯৪ বা ওয়েস্ট ইন্ডিজের ০.৭৭৭–এর চেয়ে ভালো। অস্ট্রেলিয়ার ২.৬১১ কিংবা ইংল্যান্ড ও ভারতের ২.৫৪১-এর কাছাকাছি।

পরিচিত কন্ডিশনে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে শক্তিশালী দল হয়ে উঠেছে। যদিও ইতোমধ্যে মাশরাফি, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম (টেস্ট বাকি), সাকিব আল হাসান (ওয়ানডে ফরম্যাট বাকি) ও মাহমুদউল্লাহ আন্তর্জাতিক মঞ্চ ছেড়েছেন। তবুও দেশের মাঠে সাফল্যের ধারা অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ। এর পেছনে পেসারদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের পর থেকে বাংলাদেশের সিমারদের বোলিং গড় পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে চতুর্থ সেরা এবং ইকোনমি রেট দ্বিতীয় সেরা। এই দুই সূচকে একসঙ্গে তাদের চেয়ে এগিয়ে নেই কোনো দল।

পরিসংখ্যানও বলছে, পরিবর্তনটা কতটা বড়। ২০২২ সালের আগে যেখানে বাংলাদেশের পেসাররা প্রতি ওয়ানডেতে গড়ে ৩.১৫ উইকেট নিতেন, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৩.৮৫। বোলিং গড়ও কমে ৩৬.০৬ থেকে ৩০.৫৭-এ নেমেছে।

নতুন প্রজন্মের হাত ধরে বাংলাদেশের পেস বিভাগের চিত্র বদলে দিয়েছে। এখন বাংলাদেশের হাতে একাধিক মানসম্মত পেসার আছে। সম্প্রতি ঘরের মাঠে পাকিস্তান সিরিজে অভিজ্ঞ তাসকিন ও মুস্তাফিজের সঙ্গে ইতিহাসের দ্রুততম বাংলাদেশি বোলার নাহিদ রানাকে নিয়মিত ব্যবহার করা হয়। তিন ম্যাচে এই পেসত্রয়ী নেন ১৯ উইকেট, গড় ২১.৪২। সিরিজ শেষে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ তাদের ‘সেরা বোলিং বিকল্প’ হিসেবে উল্লেখ করেন, যারা দলকে ‘ম্যাচ জয়ের অধিক সুযোগ’ এনে দেন।

আরও আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো– তাসকিন ও মুস্তাফিজের বয়স এখনও ৩১ পূর্ণ হয়নি, কিন্তু তাদের রয়েছে এক দশকের বেশি ওয়ানডে খেলার অভিজ্ঞতা। বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতে বাংলাদেশের মুখ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন মুস্তাফিজ। নাহিদ ২৩, শরিফুল ২৪, হাসান মাহমুদ ২৬ এবং তানজিম হাসান সাকিব ২৩। অর্থাৎ, তাদের সেরা সময় সামনে, যদিও ইতোমধ্যে নিজেদের ছাপ রেখেছেন সবাই।

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়