সোমবার, ৬ই এপ্রিল ২০২৬, ২৩শে চৈত্র ১৪৩২


আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রতিকূলতাসমূহ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২০

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

একটি সরকারের মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সবার জন্য স্বাভাবিক রাখা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা। জনগণকে সার্বক্ষণিক নাগরিক সেবা প্রদান করার লক্ষ্যে সরকার নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে।

সরকারের উদ্দেশ্যই হচ্ছে জনগণের সুবিধা অসুবিধাকে গুরুত্ব দিয়ে আইনশৃঙ্খলা কাঠামোকে ঢেলে সাজানো। বাংলাদেশের সরকারেরও উচিত হবে জনগণের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ বিবেচনায় নিয়ে পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক রাখা। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জন্য অপরাধ প্রতিকারে আধুনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে দক্ষ জনসম্পদ তৈরির যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ সংক্রান্তে সরকারকে যেসব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হবে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় অবতারণা করা হলো।

প্রথমত, বাংলাদেশ পুলিশ সাধারণত রিঅ্যাকটিভ পুলিশিং অনুশীলন করে থাকে। এ পুলিশিং ব্যবস্থাপনায় জনগণ একেবারেই সন্তুষ্ট নয়। রিঅ্যাকটিভ পুলিশিং হচ্ছে অপরাধ ঘটার পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ঘটনার বিষয়ে অবহিত হয়ে অপরাধীকে গ্রেফতারের চেষ্টা করে থাকে।

এ পুলিশিং ব্যবস্থাপনায় তদন্ত কাজ পরিচালনায় বিভিন্ন রকমের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। যার দরুণ তদন্ত কাজে ত্রুটি বিচ্যুতি দেখা যায় এবং পুলিশ প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়। যদিও আলামত ও সাক্ষ্য প্রমাণ সঠিকভাবে সংরক্ষিত হয় তথাপি তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অজ্ঞতার কারণে অনেক মামলা সঠিকভাবে নিষ্পত্তি হয় না।

সে কারণে সরকারের মূল কাজ হবে প্রোঅ্যাকটিভ পুলিশিং ব্যবস্থা চালু করার লক্ষ্যে সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা। অর্থাৎ ঘটনা ঘটার পূর্বেই পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সম্ভাব্য সব ধরনের ক্ষয়ক্ষতি থেকে ভুক্তভোগীকে রক্ষা করার চেষ্টা করবে।

এক্ষেত্রে সরকারের ইন্টিলিজেন্সি (গোয়েন্দা) ইউনিটকে সম্ভাব্য সক্ষমতায় উন্নত করার সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। কোনো ঘটনার সম্ভাব্য আলামত পাওয়া মাত্রই সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে তড়িৎ গতিতে ব্যবস্থা গ্রহণই পারে অপরাধ প্রতিকারে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে। কাজেই প্রোঅ্যাকটিভ পুলিশিং বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ সরকারকে গ্রহণ করতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব প্রোঅ্যাকটিভ পুলিশিংকে কার্যকর করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বেস্ট প্র্যাকটিসেস হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ওয়াচম্যান স্টাইল পুলিশিং অত্যন্ত জনপ্রিয়। ওয়াচম্যান স্টাইল পুলিশিং এমন এক ব্যবস্থা যেখানে পুলিশ সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণের মতামতের ভিত্তিতে পুলিশিং প্রয়োগ করার চেষ্টা করে থাকে। অর্থাৎ কোনো একটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নেতৃত্বে উক্ত থানা পরিচালিত হয় এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট থানার প্রত্যেক ইউনিয়নের জন্য আলাদা আলাদা সাব-ইন্সপেক্টরকে দায়িত্ব প্রদান করে থাকে।

থানার ওসি সংশ্লিষ্ট থানাধীন প্রত্যেকটি ইউনিয়নের জনগণের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমকে উক্ত এলাকার প্রয়োজনীয়তা জেনে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করে তবে সেটিই ওয়াচম্যান স্টাইল পুলিশিং ব্যবস্থাপনা। এর মধ্যে ওই এলাকায় কোন অপরাধের মাত্রা বেশি, কখন পুলিশের টহলের প্রয়োজন রয়েছে, মাদক প্রতিহতে কোন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি সামগ্রিক বিষয় জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণই ওয়াচম্যান স্টাইল পুলিশিং। এ ব্যবস্থাপনার মধ্যে সরাসরি জনগণের ইচ্ছাকে গুরুত্ব প্রদান করা হয়ে থাকে।

তৃতীয়ত, বিট পুলিশিং-এর কার্যকারিতাকে প্রসারিত করতে হবে। বিট পুলিশিং এর নীতি ও কার্যক্রমকে জনগণ সাধুবাদ জানিয়েছে। কাজেই বিটকে জোরালো করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে সরকারকে এবং যেসব এলাকায় কিশোর অপরাধের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি দেখা যায় সেসব এলাকায় বিট পুলিশিং কার্যকরভাবে প্রয়োগ করলে কিশোর অপরাধের ভয়াবহতা কমে আসবে।

জনগণ বিট পুলিশিং-এর কার্যক্রমকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছে। কেননা বিট পুলিশিং সংশ্লিষ্ট এলাকায় জনগণের সন্তুষ্টি অর্জনে সহযোগিতা করতে পেয়েছে। যদিও বিট পুলিশিং-এ জনবল একেবারেই কম, তাই কাজের পরিধি ইচ্ছে করলে বৃদ্ধি করতে পারছে না বিদ্যমান বিট ব্যবস্থাপনায়। সরকারকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের মধ্য দিয়ে জনগণের দোরগোড়ায় নাগরিক সেবা নিশ্চিতে কাজ করতে হবে।

চতুর্থত, কমিউনিটি পুলিশিংকে সক্রিয় ও কার্যকর করতে হবে। কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থাপনায় জনগণ পুলিশের ভূমিকা পালন করে এবং কমিউনিটিতে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানও কমিউনিটি পুলিশিং করে থাকে। এর মাধ্যমে দেখা যায়, প্রত্যেকের ইতিবাচক ও সক্রিয় ভূমিকার কারণে সমাজ থেকে যাবতীয় অনাচার, অপরাধ ও নৈরাজ্য দূরীভূত হয়।

কমিউনিটি পুলিশিং কমিটি গঠনকালে যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় কমিটি প্রণয়ন করা হয় তাহলে হিতে বিপরীত হয় এবং জনগণ কমিউনিটি পুলিশিং থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। বিভিন্ন সময়ে দেখা গিয়েছে, দালালচক্র যখন কমিউনিটি পুলিশিং-এর কমিটিতে থাকার সুযোগ পেয়েছে তখন থেকেই কমিউনিটি পুলিশিং এর কার্যক্রমে থেকে মানুষ আস্থা হারিয়েছে।

রবার্ট পিল (Robert Peel) প্রণীত কমিউনিটি পুলিশিং এর মূল দর্শন হচ্ছে, ‘জনগণই পুলিশ এবং পুলিশই জনতা’ অর্থাৎ প্রত্যেক জনগণ পুলিশ-এর ভূমিকায় উত্তীর্ণ হয়ে দায়িত্ব পালন করবেন। একটি সমাজে কমিউনিটির মানুষের সংস্পর্শ ব্যতীত কোনোভাবেই মাদক প্রবেশ করতে পারে না।

এখন সমাজ যদি উদ্যোগী হয়ে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান করতে ব্রতী হয়ে উঠে তাহলে খুব সহজেই সমাজ থেকে মাদক প্রতিহত করা সম্ভব। কেবলমাত্র মাদক নয়, অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে কমিউনিটির সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সুফল পাওয়া সম্ভব। কাজেই সরকারকে সঠিক পদ্ধতিতে কমিউনিটি পুলিশিং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।

পঞ্চমত, আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রের কাছে সব নাগরিক সমানভাবে বিবেচিত হবে, এটা বাস্তবে রূপদানের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো মানুষকে হয়রানি করা যাবে না, আবার রাজনৈতিক বিবেচনায় আইনকে ফাঁকি দিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে, এমন ব্যবস্থারও বিলীন করতে হবে।

কোনো আসামির জামিন পাওয়া না-পাওয়া আদালতের বিষয়, এখানে সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকার যদি এতদসংক্রান্তে হস্তক্ষেপ করে তাহলে আইনের শাসন বাঁধাগ্রস্ত হয়, সরকারের ওপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলে।

ষষ্ঠত, সব ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে সরকারকে জিরো টলারেন্স (শূন্য সহিষ্ণু) নীতি প্রণয়ন করতে হবে। অপরাধীর একমাত্র পরিচয় অপরাধী, তার অন্য কোনো পরিচয় থাকতে পারে না। আত্মীয়করণ, রাজনৈতিক সহকর্মী ইত্যাদি পরিচয়ে কোনো মানুষকে বিশেষ সুবিধা প্রদান করা যাবে না।

আবার ঘুষ লেনদেনের কারণে অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যায়, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। পুলিশের দুর্নীতির ব্যাপারে লাগাম টেনে ধরতে হবে। পুলিশের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিতে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

সরকারকে আইনের শাসনের ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। মব সংস্কৃতির নিষ্পত্তি ঘটাতে হবে। অপরাধীর বিচার করবে রাষ্ট্র, কোনো মানুষ অন্য মানুষকে দোষী হিসেবে অভিযুক্ত করে বিচার করতে পারে না। তাহলে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে যায়, রাষ্ট্রের কাঠামো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি পড়ে। সুতরাং অপরাধের শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মানুষের কাছে রাষ্ট্রের অবস্থানের ব্যাপারে সহজেই বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। 

পরিশেষে অপরাধ প্রতিরোধে জনগণকে একীভূত করার উদ্যোগ সরকারকেই গ্রহণ করতে হবে। এর জন্য অপরাধের ভয়াবহতার ব্যাপারে জনসাধারণকে সচেতন করার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। মানুষ যাতে অবলীলায় থানা থেকে নাগরিক সেবা গ্রহণ করতে হবে সে ব্যাপারে সরকারের মনিটরিং জোরালো করতে হবে।

জনগণকে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারি কোনো কর্মকর্তা কর্মচারীর গাফিলতি প্রমাণ হলে সরকারের পক্ষ থেকে তড়িৎ গতিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করে মানুষকে আশ্বস্ত করতে হবে। কাজেই উপরোল্লিখিত চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলা করার মধ্য দিয়ে সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক ও সহনশীল পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারে। 

মো. সাখাওয়াত হোসেন : সহকারী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত বিষয়:

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়