রবিবার, ২২শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০ই ফাল্গুন ১৪৩২


নির্বাচিত সরকারের কাছে পর্যটন খাতের প্রত্যাশা : টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:৪৮

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকদের প্রত্যাশাও নতুনভাবে জন্ম নেয়। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—সব খাতের মতোই পর্যটন খাতও তাকিয়ে থাকে নীতিনির্ধারকদের সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্তের দিকে। কারণ পর্যটন কেবল বিনোদন নয়; এটি কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক কূটনীতির শক্তিশালী মাধ্যম।

বাংলাদেশের পর্যটনের ভিত্তি তার অনন্য প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পদ। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ সুন্দরবন, প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন, এবং ইউনেস্কো স্বীকৃত পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, ঢাকার MICE (Meeting, Incentives, Conferences and Exhibitions) ট্যুরিজম—সব মিলিয়ে সম্ভাবনার কোনো ঘাটতি নেই।

তবু আন্তর্জাতিক পর্যটক আগমন, গড় ব্যয় এবং অবস্থানকাল—সব ক্ষেত্রেই আমরা এখনো দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে। এ অবস্থায় নির্বাচিত সরকারের কাছে প্রথম প্রত্যাশা—একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পর্যটন নীতি, যেখানে অবকাঠামো, বিপণন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষা একসঙ্গে বিবেচিত হবে।

এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলোর আধুনিকায়ন খুবই জরুরি (বিশেষ করে হযরত শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর)। বিভিন্ন পর্যটন করিডোর উন্নয়ন (ঢাকা-কক্সবাজার, ঢাকা-সিলেট, চট্টগ্রাম-বান্দরবান) নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে থাকা আবশ্যক। আধুনিকে বিশ্বে প্রতিটি স্থানে স্মার্ট সাইনেজ, ভিজিটর ইনফরমেশন সেন্টার থাকলে পর্যটন শিল্পের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে এবং ভ্রমণ সহজ, নিরাপদ ও সময়-সাশ্রয়ী হয়।

পর্যটন বিকাশের পূর্বশর্ত নিরাপদ ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা। আঞ্চলিক বিমানবন্দর উন্নয়ন, সড়ক ও রেল সংযোগ সম্প্রসারণ, পর্যটন-সহায়ক সাইনেজ ও তথ্যকেন্দ্র স্থাপন—এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিশেষ করে কক্সবাজার, সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।

একই সঙ্গে ডিজিটাল অবকাঠামো যেমন অনলাইন ভিসা, ই-টিকিটিং, পর্যটন তথ্যভাণ্ডার—এই খাতকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে পারে। অন্যদিকে ডেটা-ড্রিভেন নীতি পর্যটক আগমন, ব্যয়, অবস্থানকাল—রিয়েল-টাইম ডেটা সংগ্রহ এই শিল্পের উন্নয়নে সম্যক ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্টিং (Tourism Satellite Account) চালু করা যেতে পারে।

অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন পরিবেশের জন্য হুমকি। সেন্ট মার্টিনে প্রবাল ক্ষয়, সুন্দরবনে দূষণ, পাহাড়ি অঞ্চলে বর্জ্য সমস্যা—এসব বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। নতুন সরকারের উচিত ‘কোয়ালিটি ওভার কোয়ান্টিটি’ নীতি গ্রহণ করা—অর্থাৎ কম পর্যটক কিন্তু উচ্চ ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নিশ্চিত করা।

ইকো-ট্যুরিজম, কমিউনিটি-বেইজড ট্যুরিজম এবং সবুজ সার্টিফিকেশন চালু করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে অংশীদার করা গেলে পর্যটন হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই। পরিবেশ গবেষক Geoffrey Wall দেখিয়েছেন যে নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন পরিবেশগত চাপ সৃষ্টি করে—বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

পর্যটনের প্রাণ হলো সেবা। আন্তর্জাতিক মানের আতিথেয়তা নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ, ভাষা দক্ষতা, ডিজিটাল মার্কেটিং ও গ্রাহকসেবা বিষয়ে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। হোটেল ম্যানেজমেন্ট ও ট্যুর অপারেশন প্রশিক্ষণে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বাড়ানো সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও ভ্রমণবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা বিশেষ করে নারী ও বিদেশি পর্যটকদের জন্য—সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অর্থনীতিবিদ Ramesh Durbarry দেখিয়েছেন পর্যটন সরাসরি জিডিপি ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে—তাই দক্ষ জনবলই হবে মূল চালিকা শক্তি।

বাংলাদেশকে একটি স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড হিসেবে বিশ্ব-দরবারে তুলে ধরা জরুরি। ‘Beautiful Bangladesh’ স্লোগানের বাইরে গিয়ে নির্দিষ্ট থিমভিত্তিক প্রচারণা যেমন বৌদ্ধ ঐতিহ্য, নদীভিত্তিক পর্যটন, ম্যানগ্রোভ সাফারি, সাংস্কৃতিক উৎসব—এই ধরনের মার্কেট টার্গেটিং প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা, ডিজিটাল ক্যাম্পেইন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সম্পৃক্ততা—এসব কৌশল সরকার গ্রহণ করতে পারে।

পর্যটনে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে সহজ লাইসেন্সিং, কর-প্রণোদনা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা দরকার। হঠাৎ সিদ্ধান্ত, নীতির অসামঞ্জস্য বা অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে।

নির্বাচিত সরকারের কাছে প্রত্যাশা একটি স্বচ্ছ ও পূর্বানুমেয় নীতি কাঠামো। এক্ষেত্রে প্রয়োজন শক্তিশালী নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। এছাড়া ২০-২৫ বছরের ন্যাশনাল ট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন বর্তমানে অপরিহার্য।

কারণ রাজনৈতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও ধারাবাহিক নীতি বাস্তবায়ন পর্যটন খাতকে সঠিক পথে ধাবিত করে। গবেষক Richard Butler দেখিয়েছেন, সঠিক সময়ের নীতিগত হস্তক্ষেপ না হলে গন্তব্য অবক্ষয়ের দিকে যায়। তাই কক্সবাজারের মতো পরিপক্ব গন্তব্যে পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনা জরুরি।

বাংলাদেশের পর্যটন খাত এখন সন্ধিক্ষণে। কয়েক বছরে পর্যটন খাত অর্থনৈতিক উন্নয়নের তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছে। এখন সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই খাত হতে পারে কর্মসংস্থানের অন্যতম বৃহৎ উৎস এবং টেকসই উন্নয়নের চালিকাশক্তি।

নির্বাচিত সরকারের প্রতি আহ্বান, পর্যটনকে বিলাসিতা নয় বরং অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে স্থান দিন। কারণ সঠিকভাবে পরিচালিত পর্যটন কেবল আয় বাড়ায় না, এটি একটি দেশের ভাবমূর্তি, সংস্কৃতি ও মানুষের আত্মবিশ্বাসকেও বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল করে তোলে।

ড. সামশাদ নওরীন : সহযোগী অধ্যাপক, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত বিষয়:

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়