সোমবার, ৩০শে মার্চ ২০২৬, ১৬ই চৈত্র ১৪৩২
ফাইল ছবি
ইরানের পার্লমেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় উঠে আসছেন। চলমান যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
পাকিস্তানি একটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির পাশাপাশি ঘালিবাফকেও ইসরায়েলের ‘হিট লিস্ট’ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানের সূত্র বলেছে, “ইসরায়েলিদের কাছে তাদের অবস্থান জানা ছিল এবং তারা তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিল। আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছি, যদি তাদেরও নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়, তাহলে কথা বলার মতো আর কেউ থাকবে না। তাই যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলিদের পিছিয়ে যেতে বলেছে।”
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে পাকিস্তান অন্যতম।
যদিও ৬৪ বছর বয়সী এই ব্যক্তি শত্রুদের সতর্ক করেছেন, ‘আমাদের ভূমি রক্ষার সংকল্পকে’ পরীক্ষা না করার জন্য এবং এক্স পোস্টে ‘অবিরাম হামলার’ হুমকি দিয়েছেন।
তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর মতে, কিছু মার্কিন কর্মকর্তা তাকে দিয়ে কাজ চালানো যায়— এমন একজন অংশীদার হিসেবেই দেখে থাকেন।
গালিবাফ অতীতে বেশ কয়েকবার রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ব্যর্থ হয়েছেন।
কিন্তু যেহেতু মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় অনেক শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন, তাই অভিজাত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তার অভিজ্ঞতা এবং একজন বাস্তববাদী, কিন্তু কট্টরপন্থী হিসেবে তার ভাবমূর্তি তাকে ক্ষমতার এক নতুন স্তরে পৌঁছে দিতে পারে।
'লাঠি ব্যবহার করতে পেরে গর্বিত'
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবি-র মালিকানাধীন আরবি ভাষার টিভি চ্যানেল আল-আলামের তথ্য অনুযায়ী, গালিবাফ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর তোরঘাবেহ-এর একটি ধর্মপ্রাণ, শ্রমিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
তার জন্মস্থান মাশহাদের কাছাকাছি, যেখানে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বসবাস করতেন।
১৬ বছর বয়সে সে সময় তিনি মাশহাদের প্রধান মসজিদগুলোয় ইরানের ভবিষ্যত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ অন্যান্য বিপ্লবী আলেমদের ক্লাসে অংশ নিতে শুরু করেন।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পরপরই গালিবাফ ইরাক যুদ্ধে অংশে নেন এবং ২০ বছর বয়সে আইআরজিসি-তে যোগ দেন।
দুই বছর পর তিনি এই বাহিনীর একটি কমব্যাট ডিভিশনের কমান্ডার হন। ১৯৮৮ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
আল-আলামের তথ্যমতে, গালিবাফ আইআরজিসি কমান্ডার হওয়ার বছরেই বিয়ে করেন এবং সেই বিয়ে হয়েছিল সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি’র তত্ত্বাবধানে। গালিবাফ এবং তার স্ত্রীর দম্পতির তিন সন্তান আছে।
যুদ্ধের পর গালিবাফ পদমর্যাদায় আরও উপরে উঠতে থাকেন এবং ১৯৯৭ সালে আইআরজিসি বিমান বাহিনীর কমান্ডার হন।
১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে একটি সংস্কারপন্থী সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদে ছাত্র বিক্ষোভে ইসলামী প্রজাতন্ত্র উত্তাল হয়ে ওঠে। আন্দোলনটি সহিংসভাবে দমন করা হয়, যার ফলে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয় এবং ধারণা করা হয় যে গালিবাফ ব্যক্তিগতভাবে এই দমন অভিযানে জড়িত ছিলেন।
ফাঁস হওয়া একটি অডিও ফাইলে তাকে বলতে শোনা যায়, "এখন ১০০০ সিসির মোটরবাইকে লাঠি হাতে আমার একটি ছবি আছে... যেখানেই রাস্তায় নেমে আসা এবং লাঠি ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়, আমরাই তারা যারা সেটা করি। এবং আমরা এতে গর্বিত।"
বিক্ষোভের পর আইআরজিসি-র চব্বিশ জন কমান্ডার তৎকালীন ইরানের রাষ্ট্রপতি ও সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ খাতামিকে কড়া ভাষায় লেখা একটি চিঠিতে আইআরজিসির হস্তক্ষেপের হুমকি দেন। গালিবাফ বলেন, তিনি সেই দুজন কমান্ডারের একজন ছিলেন, যারা চিঠিটির খসড়া তৈরি করেছিলেন এবং স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছিলেন।
অনেকেই এই চিঠিটিকে রাজনৈতিক বিষয়ে আইআরজিসি-র প্রভাবের একটি স্পষ্ট ঘোষণা হিসেবে দেখেন — যা তখন থেকে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
পুলিশ প্রধান থেকে তেহরানের মেয়র
ছাত্র বিক্ষোভের এক বছর পর ৩৯ বছর বয়সে গালিবাফ পুলিশ প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন।
তার পাঁচ বছরের কার্যকালে, তিনি একটি জাতীয় জরুরি পুলিশ হটলাইন স্থাপন করেন এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়াকে সহজ করেন।
পুলিশ বাহিনীকে বিদেশি যানবাহন দিয়ে সজ্জিত করাকে তিনি তার সেরা অর্জন হিসেবে গর্ব করতেন। যদিও সমালোচকদের মতে, এটা ছিলো অনেক ব্যয়বহুল।
২০০৫ সালে গালিবাফ পুলিশ প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর, তিনি তেহরানের সিটি কাউন্সিল কর্তৃক মেয়র হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি ১২ বছর এই পদে ছিলেন এবং এখনও রাজধানীর মেয়র হিসেবে দীর্ঘতম মেয়াদের রেকর্ডটি তাঁর দখলেই রয়েছে।
যানজটপূর্ণ রাজধানীতে মেট্রো ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং 'সদর এক্সপ্রেসওয়ের' মতো পরিবহন অবকাঠামোর আধুনিকায়নের কৃতিত্ব তাঁকে দেওয়া হয়।
কিন্তু ২০১৬ সালে 'বিপুল মূল্যের সম্পত্তি' কেলেঙ্কারির পর গালিবাফের সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়, যেখানে সিটি কাউন্সিলের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা কর্মীদের কাছে শত শত সম্পত্তি বাজার মূল্যের চেয়ে পঞ্চাশ শতাংশ পর্যন্ত বিশাল ছাড়ে বিক্রি করার অভিযোগ ওঠে।
গালিবাফ ক্ষমতা ছাড়ার কয়েক মাস আগে, ইরানের অন্যতম প্রাচীন উঁচু ভবন, ১৭ তলা বিশিষ্ট প্লাস্কো বিল্ডিং-এ আগুন লেগে সেটি ধসে পড়ে এবং এতে অন্তত ২০ জন দমকলকর্মী নিহত হন। এই দুর্ঘটনাটি গালিবাফের নেতৃত্বে নগর সরকারের মধ্যে পদ্ধতিগত অবহেলাকে তুলে ধরে।
তবে এরপরও কোনো কেলেঙ্কারির কারণেই গালিবাফকে বরখাস্ত বা এমনকি অভিশংসনও করা হয়নি এবং তিনি রেহাই পেয়ে যান।
২০২০ সালে তিনি পার্লমেন্ট নির্বাচনে একটি আসন জিতে স্পিকার হন।
রাষ্ট্রপতি পদে ব্যর্থ প্রচেষ্টা ও স্পিকার পদ
গালিবাফ সবসময়ই রাষ্ট্রপতি পদের দিকে নজর দিয়েছেন। কিন্তু ২০০৫, ২০১৩, ২০১৭ এবং ২০২৪ সালে তার চারটি চেষ্টাই ব্যর্থ হয়।
তার প্রথমবারের চেষ্টায়, অভিজ্ঞ এই আইআরজিসি সৈনিক তাঁর সামরিক ব্যাকগ্রাউন্ডকে বেশি তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু পরে তিনি নিজেকে একজন পাইলট এবং পলিটিক্যাল জি৮ওগ্রাফিতে পিএইচডি ডিগ্রিধারী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেন। তিনি নিজেকে একজন 'জিহাদি সংগঠক' হিসেবেও আখ্যা দিয়েছেন এবং সামরিক দক্ষতা ও নিষ্ঠার বড়াই করেছেন।
গালিবাফকে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার বিরোধী হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন লক্ষণ দেখা গেছে, যা থেকে বোঝা যায় যে তিনি রক্ষণশীল শিবিরের একাংশের সঙ্গে একটা পার্থক্য তৈরি করেছেন।
২০২৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে, কট্টরপন্থী রক্ষণশীলদের একটি বড় অংশ তাঁর প্রার্থিতার বিরোধিতা করেছিল এবং তাকে প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করেছিল।
২০২২ সালে গালিবাফ আবারও একটি দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন। তুরস্ক সফর শেষে বিমানবন্দরে তার পরিবারের একটি স্ট্রলারসহ শিশুর ব্যবহারের বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামের ছবি প্রকাশ্যে আসে, যা ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়।
তার সমালোচকরা তাকে ‘ভণ্ডামি, কপটতা এবং ভণ্ড ধার্মিকতা’-র জন্য অভিযুক্ত করেন, কিন্তু তিনি তার সমর্থকদের বলেন যে, এই মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তাকে ইরানের রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা।
এই কেলেঙ্কারিতেও গালিবাফ ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান এবং ২০২৪ সালে স্পিকার হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হন।
ইরান যখন একটি সংকটময় সময়ে, তখন তার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার ও ক্ষমতার তিনটি প্রধান শাখার শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করার সক্ষমতার কারণে তার রাজনীতির ভাগ্য আবারও খুলে যেতে পারে।
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)