সোমবার, ৬ই এপ্রিল ২০২৬, ২৩শে চৈত্র ১৪৩২


সিলেট-আখাউড়া রেলপথে মহা ঝুঁকি : এক সপ্তাহে ৪ বড় দুর্ঘটনা

মৌলভীবাজার থেকে

প্রকাশিত:৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ব্রিটিশ শাসনামলে সিলেট-আখাউড়া রেলপথ স্থাপন করা হয় পণ্য সরবরাহের জন্য। তবে সময়ের সাথে সাথে পণ্যের পাশাপাশি রেলপথে যাত্রীরা চলতে শুরু করেন। ট্রেন যাত্রা নিরাপদ ও আরামদায়ক হওয়ায় যাত্রীর সংখ্যাও অনেক বৃদ্ধি পায়। তবে শতবছর পেরিয়ে গেলেও পুরোনো এই রেলপথ সিলেট অঞ্চলের মানুষের জন্য এখন শুধু ঝুঁকিপূর্ণ নয়, মহা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গত একমাসে এই রুটে পুরোপুরি ইঞ্জিন বিকলসহ আংশিক বিকল হয়ে বিলম্ব করে গন্তব্যে পৌঁছেছে অন্তত ৫০টি ট্রেন। সবশেষে টানা তিনদিনে বড় ধরনের তিনটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ইঞ্জিন বিকল ও সংকটের কারণে প্রতিদিন একাধিক ট্রেন বিলম্ব করে ছেড়ে আসে। আর এতে করে চরমভাবে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে এই অঞ্চলের ট্রেন যাত্রীদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত পর্যটকদের।

সিলেট রুটে গত একসপ্তাহে ট্রেনের আলোচিত ৪টি দুর্ঘটনা ঘটছে। বৃহস্পতিবার ২ এপ্রিল হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার মনতলায় সিলেটগামী তেলবাহী ট্রেনের ৫টি ওয়াগন লাইনচ্যুত হয়ে ১৪ ঘণ্টার বেশি সময় রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল।

বুধবার (১ এপ্রিল) কুমিল্লায় সিলেট থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের তিনটি বগি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ সময় বগি তিনটি লাইনের ওপর রেখে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে চলে যায় ট্রেনটি। মঙ্গলবার ৩১ মার্চ মৌলভীবাজারের ভানুগাছ-শমশেরনগর এলাকায় উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হওয়ার কারণে ট্রেন চলাচল বিঘ্নিত হয়। এর আগে গত ২৬ মার্চ ভৈরব বাজার জংশনে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হওয়ায় সিলেট রুটের ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসন আমলে আসাম ও চট্টগ্রামের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে ১৮৯৮ সালে সিলেট, কুলাউড়া ও আখাউড়া হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন করা হয়। পুরোনো ইঞ্জিন ও দুর্বল অবকাঠামোর কারণে নিয়মিত ইঞ্জিন বিকল হওয়ায় ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায় রাতের বেলা আপ উঠার সময় বেশিরভাগ ট্রেন আটকা পড়ে। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে সিলেট রুটে প্রতিদিন ছয়টি আন্তঃনগর ট্রেন চলে। এর মধ্যে চারটি ট্রেন সিলেট-ঢাকা এবং দুটি সিলেট-চট্টগ্রামে চলাচল করে। এই ছয়টি ট্রেনে প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার যাত্রী আসা-যাওয়া করেন। এরসাথে রয়েছে মৌলভীবাজার ও সিলেট আসা পর্যটক। সবমিলিয়ে বছরে প্রায় ১০ কোটি যাত্রী ভোগান্তি নিয়েই চলতে হয় সবসময়।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২৬১০, ২৯০২সহ বেশ কিছু নম্বরের পুরাতন ইঞ্জিন সিলেট রুটে দেওয়া হয়েছে। এই ইঞ্জিনগুলো অনেক পুরাতন থাকায় লাউয়াছড়া বনাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় উঠার সময় বিকল হয়ে যায়। আর এতে অনেক সময় পুরাতন ইঞ্জিনগুলো আংশিক বিকল ও পুরোপুরি বিকল হয়ে যায়। তবে বিভিন্ন ট্রেনে ভালো ইঞ্জিন যখন দেওয়া হয়, তখন সহজেই পাহাড়ি এলাকা অতিক্রম করতে পারে। পুরাতন ইঞ্জিন নিয়ে প্রায় প্রতিদিন ট্রেনের শিডিউল বিলম্বিত হয়। কারণ যে ইঞ্জিন ঢাকা থেকে সিলেট আসে একই ট্রেন একই ইঞ্জিন নিয়ে আবার ফিরতে হয়।

এছাড়া সিলেট- আখাউড়া রেলপথে অন্তত দশটি সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এসব সেতুতে রেলের গতি কমিয়ে চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রেললাইন থেকে নিয়মিত নাট, বল্টু ও ক্লিপ চুরি হচ্ছে। রেললাইনে পর্যাপ্ত নাট-বল্টু ও ক্লিপার না থাকায় তীব্র গরমে লাইন বাঁকা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। টুকটাক লাইন মেরামত করা হলেও নতুন রেললাইন বা বড় ধরনের মেরামতের উদ্যোগ নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষরা। পুরাতন রেললাইন থাকায় কোনো কারণ ছাড়াই ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। ফলে এই অঞ্চলে সাধারণ যাত্রী ও আগত পর্যটকেরা যাতায়াত ব্যবস্থায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।

বাংলাদেশ রেলওয়ে বলছে, হঠাৎ করে সিলেট-আখাউড়া রুটে কেন ঘনঘন এমন ঘটনা ঘটছে তা বুঝতে পারছে না। দেশে চাহিদার তুলনায় ৭০ শতাংশ ট্রেনের ইঞ্জিন আছে। এজন্য পুরতন ইঞ্জিন দিয়ে চলতে হচ্ছে। প্রয়োজনে ইঞ্জিন মেরামত করা হয়। এছাড়া বিকল্প কোনো রাস্তা নেই। অবকাঠামো যেখানে প্রয়োজন সেখানে মেরামত করা হয়। এই অঞ্চলে রেলের অবকাঠামো যে পুরোপুরি ঝুঁকিপূর্ণ সেটা বলা যাচ্ছে না, আবার পুরো খারাপ সেটাও বলা যাচ্ছে না।

এই অঞ্চলের সাধারণ ট্রেন যাত্রী ও পর্যটক যাত্রীরা দাবি জানিয়ে বলেন, দ্রত সময়ে সিলেট-আখাউড়া রেলপথ দুই লাইনে করা হোক। একই সাথে পুরাতন ও দুর্বল ইঞ্জিন পরিবর্তন করে নতুন ইঞ্জিন যুক্ত করা হোক। যাতে সাধারণ যাত্রীরা নিরাপদে ট্রেনে যাতায়াত করতে পারেন।

শওকত আহমেদ নামে একজন প্রবাসী বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে আমার ফ্লাইট ছিল রাত ১ টায়। শমশেরনগর রেলস্টেশন থেকে জয়েন্তিকা ট্রেনে যাওয়ার কথা ছিল। দুপুর দেড়টার আসার কথা থাকলেও বিকেল ৪টায় এসেছে। পরে আমি গাড়ি রিজার্ভ করে ঢাকা এসেছি।

উপবন এক্সপ্রেসের ঢাকা থেকে সিলেটগামী যাত্রী আমির উদ্দিন ট্রেনের দুর্ভোগের কথা বলে তিনি জানান, সোমবার রাতে ঢাকা থেকে রাত ১০টায় ছাড়ার কথা থাকলেও রাত ১২টায় ছেড়ে আসে ট্রেনটি। সকাল ৬ টায় শমশেরনগর ভানুগাছ রেলস্টেশনে মধ্যে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। ভোর ৫টায় সিলেট যাওয়ার কথা থাকলেও দুপুর ১২টায় এসেছি। সিলেটের ট্রেন যাত্রীদের সাথে নিয়মিত এমন ঘটনা ঘটছে। রেলপথ যেন এখন কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঘনঘন রেলের ইঞ্জিন বিকল হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক)
আহমেদ মাহবুব চৌধুরী বলেন, আমিও বুঝতে পারছি না হঠাৎ করে এই রুটে কেন এই সমস্যাটা বেড়ে গেল। এর বিশেষ কোনো কারণ আছে কিনা দেখতে হবে। ট্রেনের ইঞ্জিনের সমস্যা আছে ঠিক, তবে ঈদের পর থেকে বেশি সমস্যা হচ্ছে। আমরা খোঁজ খবর নিচ্ছি কি কারণে এই সমস্যাটা বেড়ে গেছে। হবিগঞ্জের তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় ৫ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ঝুকিপূর্ণ অবকাঠামোর বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান বলেন, আমাদের সারাদেশে ৮৫টি রেলের ইঞ্জিন প্রয়োজন। তবে আমাদের আছে ৭০ শতাংশ। এজন্য আমাদের কিছু সমস্যা হচ্ছে; অনেক ট্রনের বিলম্ব হয়। এই জায়গায় কিছু সমস্যা আছে। নতুন করে এডিপির একটি প্রকল্প শুরু করেছি, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এর সমস্যা সমাধান হবে। এই সময়ের জন্য সরকার একটা উদ্যোগ নিয়েছে। ইঞ্জিনগুলো ভালোভাবে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অবকাঠামোর বিষয়ে তিনি বলেন, রেললাইনের অবস্থা অনুযায়ী মেরামত করা হয়। অবকাঠামো একেবারে ভালো বলব না। তবে একেবারে খারাপও না। লাইনের অবস্থা অনুযায়ী রেলের গতি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। অবকাঠামোর জন্য আমাদের পূর্বাঞ্চলের রেললাইন পুনর্বাসনের জন্য একটি নতুন প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন আছে। এটা অনুমোদন হলে বিভিন্ন কাজ করা যাবে।

সম্পর্কিত বিষয়:

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়