মঙ্গলবার, ১০ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৮শে মাঘ ১৪৩২


নির্বাসন থেকে ক্ষমতার দোরগোড়ায় তারেক রহমান

Jehad chowdhury

প্রকাশিত:১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮:১৪

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকায় জাতীয় নির্বাচনের আগে নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিনের সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

প্রায় দুই দশক ধরে লন্ডনে নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফেরার দুই মাসও পূর্ণ হয়নি। এর মধ্যেই বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন তারেক রহমান। তার বাবা-মা একসময় যেমন দেশ পরিচালনা করেছেন, তেমনই তিনিও দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারেন।

মতামত জরিপের পূর্বাভাস যদি সঠিক হয়, তাহলে বৃহস্পতিবারের নির্বাচন ৬০ বছর বয়সী মৃদুভাষী এই নেতার ভাগ্যের এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটাবে। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আটক হওয়ার পর মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার প্রয়োজনে দেশ ছাড়েন তিনি।

২০২৪ সালের আগস্টে তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গত বড়দিনে (২৫ ডিসেম্বর) দেশে ফেরেন তারেক রহমান। সেই সময় তাকে বীরের মতো বরণ করে নেয় তার রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

বর্তমানে নয়াদিল্লিতে নির্বাসিত রয়েছেন শেখ হাসিনা আর তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিলেন। তার বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন শীর্ষ নেতা। তিনি ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করেন এবং পরে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি বাংলাদেশকে কোনও একক শক্তির সঙ্গে অতিমাত্রায় যুক্ত না রেখে বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব নতুনভাবে সাজাবেন। তার এই প্রতিশ্রুতি শেখ হাসিনার অবস্থানের বিপরীত। শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লির ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হতো।

তিনি দরিদ্র পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি, পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে খেলনা ও চামড়াজাত পণ্যের মতো শিল্প খাতকে উৎসাহিত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ঠেকাতে প্রধানমন্ত্রীর জন্য দুই মেয়াদে ১০ বছরের সীমা নির্ধারণের প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি।

ঢাকায় ফিরে আসার পর ঘটনাপ্রবাহ এত দ্রুত ঘটেছে যে, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ স্ত্রী ও ব্যারিস্টার মেয়েকে নিয়ে দেশে ফেরার পর নিজের অনুভূতি নিয়ে ভাবার সময়ই পাননি বলে জানিয়েছেন তারেক রহমান।

রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের ফাঁকে দলের কার্যালয়ে তিনি বলেন, ‘‌‘দেশে ফেরার পর প্রতিটি মিনিট কীভাবে কেটেছে, তা আমি নিজেও বুঝতে পারছি না।’’ এ সময় তার পাশে ছিলেন মেয়ে জাইমা রহমান; যিনি বাবার পক্ষে সমর্থন জোগাড়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।

• ভাবমূর্তির বদল

তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায়। তার মা খালেদা জিয়া এবং বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান; যিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়াশোনা শুরু করলেও তা শেষ করেননি। পরে বস্ত্র ও কৃষিপণ্য খাতে ব্যবসা শুরু করেন।

দেশে ফেরার পর থেকে তারেক রহমান নিজেকে এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন, যিনি শেখ হাসিনার আমলে তার পরিবারের ওপর আসা সংকটের ঊর্ধ্বে উঠে ভাবতে পারেন। বিএনপির ২০০১-২০০৬ মেয়াদে তার মা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সেই সময় তিনি সরকারি পদে না থাকলেও তার বিরুদ্ধে বেশকিছু অভিযোগ আনা হয়। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, ‘‘প্রতিশোধ কারও জীবনে কী বয়ে আনে? প্রতিশোধের কারণে মানুষকে দেশ ছাড়তে হয়। এতে ভালো কিছু আসে না।’’ তিনি বলেন, ‘‘এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শান্তি ও স্থিতিশীলতা।’’

শেখ হাসিনার শাসনামলে তারেক রহমান দুর্নীতির বহু মামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। কয়েকটি মামলায় তার অনুপস্থিতিতে দোষী সাব্যস্ত করা হয় তাকে। ২০০৪ সালে শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ২০১৮ সালে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তিনি বরাবরের মতো সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সব মামলায় খালাস পান তিনি।

লন্ডনে বসে তিনি একের পর এক নির্বাচনে তার দলকে কোণঠাসা হতে দেখেছেন। সে সময় দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা কারাগারে গেছেন, কর্মীরা নিখোঁজ হয়েছেন, দলীয় কার্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে।

দেশে ফেরার পর তারেক রহমানকে অনেক বেশি সংযত দেখা যাচ্ছে। উসকানিমূলক বক্তব্য এড়িয়ে তিনি সংযম ও সমঝোতার আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি ‘রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানা’ ফিরিয়ে দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কথা বলছেন। নতুন শুরুর প্রত্যাশায় থাকা বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে এই বার্তা নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। তার ভাবমূর্তিকে নমনীয় করে তুলতে সহায়ক হয়ে উঠেছে পরিবারের পোষ্য সাইবেরিয়ান বিড়াল জেবু; যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান রয়টার্সকে বলেছেন, ‘‘ওর বয়স সাত বছর। ও আধা-সাইবেরিয়ান। আমরা ওকে দত্তক নিয়েছি।’’

বিএনপির ভেতরে তারেক রহমানের নিয়ন্ত্রণ শক্ত। দলীয় সূত্র বলছে, প্রার্থী নির্বাচন, কৌশল নির্ধারণ ও জোটের আলোচনা—সবকিছুই তিনি সরাসরি তদারকি করছেন। আগে এসব কাজ দূর থেকে করতেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও তা টিকিয়ে রাখাই হবে তার সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, ‘‘কেবল গণতন্ত্র চর্চার মাধ্যমেই আমরা আমাদের দেশকে সমৃদ্ধ ও পুনর্গঠন করতে পারি। আমরা যদি গণতন্ত্র চর্চা করি, তাহলে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে পারব। তাই আমরা গণতন্ত্র চর্চা করতে চাই, আমরা দেশকে পুনর্গঠন করতে চাই।’’

সম্পর্কিত বিষয়:

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়