সোমবার, ১৬ই মার্চ ২০২৬, ১লা চৈত্র ১৪৩২
ফাইল ছবি
হরমুজ প্রণালীর দখল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে উঠেছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরানের অবরোধ ভাঙতে ‘অনেক দেশ’ যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে। অন্যদিকে ফ্রান্স স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই অঞ্চলে নতুন করে কোনো যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের ১৫তম দিনেও এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি কার্যত বন্ধ রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শনিবার ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দাবি করেন, ইরানের অবরোধে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখতে কাজ করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্য এই জোটে যোগ দেবে। ট্রাম্পের এই দাবির পরপরই ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর খবর পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
ফ্রান্সের সোজাসাপ্টা ‘না’
ট্রাম্পের এই আহ্বানের পরপরই ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্যে ১০টি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়ার খবর পুরোপুরি অস্বীকার করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে ফরাসি মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ‘না। বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ পূর্ব ভূমধ্যসাগরেই অবস্থান করছে। ফ্রান্সের অবস্থান অপরিবর্তিত : রক্ষণাত্মক, সুরক্ষামূলক।’
ফ্রান্সের এই বক্তব্য ট্রাম্পের কথিত ‘মিত্র জোট’ গঠনের দাবির মুখে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
‘কোনো আমেরিকান জাহাজ নয়’
ট্রাম্প একই পোস্টে দাবি করেন যে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক সক্ষমতার ১০০% ধ্বংস করে দিয়েছে।’ যদিও পরক্ষণেই তিনি স্বীকার করেন, ‘ইরান এখনও জলপথে ড্রোন, মাইন বা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে পারে।’ ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র তীররেখা বরাবর বোমাবর্ষণ করবে এবং ইরানি নৌকা ও জাহাজগুলিকে গুলি করে উড়িয়ে দেবে।’
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের আইআরজিসি-র নৌবাহিনী প্রধান আলিরেজা তাংসিরি বলেছেন, ‘হরমুজ প্রণালী এখনও সামরিকভাবে বন্ধ করা হয়নি এবং এটি কেবল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।’ তিনি ট্রাম্পের দাবিকে মিথ্যা বলে সমালোচনা করেন।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রণালীটি দিয়ে জাহাজগুলিকে এসকর্ট করার জন্য প্রস্তুত নয়।’ অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্ট করেন যে, প্রণালীটি কেবল শত্রু এবং তাদের মিত্রদের ট্যাংকার ও জাহাজের জন্য বন্ধ।’ অন্যদিকে, ইরানের সুপ্রিম লিডারের ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী সংস্থা এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিলের সদস্য মহসেন রেজাই বলেন, ‘কোনো আমেরিকান জাহাজের উপসাগরে প্রবেশের অধিকার নেই।’
এরই মধ্যে ভারত ও তুরস্কের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পর ইরান তাদের জাহাজগুলোকে বিরল ছাড় দিয়েছে। এলপিজি বহনকারী দুটি ভারতীয় পতাকাবাহী ট্যাংকার এবং একটি তুর্কি মালিকানাধীন জাহাজ নিরাপদে প্রণালী অতিক্রম করেছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সচিব রাজেশ কুমার সিনহা নিশ্চিত করেছেন যে, দুটি ভারতীয় ট্যাংকার নিরাপদে প্রণালী অতিক্রম করেছে। ভারতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ফাতহালি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে সরাসরি আলোচনার ফলেই এই ছাড় দেওয়া হয়েছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে একটি তুর্কি মালিকানাধীন জাহাজকেও একইভাবে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। আঙ্কারা সরাসরি তেহরানের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করে এবং পথটি তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার অনুরোধ জানায়। জানা গেছে, আরও ১৪টি তুর্কি জাহাজ এখনও ছাড়পত্রের অপেক্ষায় রয়েছে।
ঝুঁকিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ
‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর মতে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে এই অবরোধ বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
এই প্রণালীটি এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) রপ্তানির জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই এলএনজি হলো নাইট্রোজেন-ভিত্তিক সার তৈরির প্রধান কাঁচামাল, যা বিশ্বের প্রধান খাদ্যশস্য এবং দানাশস্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। আর এই শস্যগুলোই বিশ্বব্যাপী মানুষের ক্যালোরি গ্রহণের ৪০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করে।
অন্যদিকে, ভারত রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকটের মুখে পড়েছে এবং ৩৩৩ মিলিয়ন (৩৩ কোটি ৩০ লাখ) এলপিজি-নির্ভর পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হচ্ছে দেশটির সরকারকে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার সতর্ক করে বলেছেন, ‘মানবিক সাহায্যবাহী পণ্য যদি নিরাপদে প্রণালী দিয়ে পার হতে না পারে, তবে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঝুঁকিতে পড়বে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা এটি নিয়ে কাজ করছি এবং এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার দরকার নেই।’
প্রসঙ্গত, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে অন্তত ১,৪৪৪ জন নিহত হয়েছে, লেবাননেও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলো ক্রমাগত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখোমুখি হচ্ছে।
কিংস কলেজ, লন্ডনের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়াস ক্রিগ আল-জাজিরাকে বলেছেন, ট্রাম্পের জোট গঠনের ডাক আসলে হরমুজ প্রণালী বন্ধের সমস্যা সমাধানের কোনো বড় পরিকল্পনার অভাব ঢাকার চেষ্টা।
তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হবে, এমন কোনো পরিকল্পনা তাদের ছিল না। বাজারকে শান্ত রাখার জন্য এবং ইরান সরকারের সঙ্গে সরাসরি কথা না বলেই কোনো অলৌকিক কিছু ঘটবে— এমন আশায় এটি করা একটি মরিয়া পদক্ষেপ বলে মনে হচ্ছে।’
ক্রিগ বলেন, প্রণালীটি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য দ্রুত কোনো সামরিক সমাধান নেই, কারণ বিমা কোম্পানিগুলোকে (শিপিং ঝুঁকি নেওয়া থেকে) দূরে রাখার জন্য ইরানকে কেবল মাঝেমধ্যে হামলা চালিয়ে গেলেই চলবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, কূটনৈতিক কোনো চুক্তি ছাড়াই নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠানো হবে কেবল ‘খুব ব্যয়বহুল সামরিক জাহাজগুলোকে সস্তা কিন্তু সম্ভাব্য অত্যন্ত কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের মুখে ফেলে দেওয়া’।
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)